আমার চোখে নাজিম হিকমত

নিউজ ডেস্ক | যুগের কণ্ঠ .কম
আপডেট : ২৪ মার্চ, ২০১৯

নাজিম হিকমতকে সোভিয়েত ইউনিয়নে অনেকেই ডাকত ‘নীলচোখো দানব’ নামে। নারীরা তাঁকে ভালোবাসত।


তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, তাঁর সবচেয়ে উথালপাতাল করা ভালোবাসা ছিল ভেরা তুলিয়াকোভার প্রতি, এটাই ছিল নাজিমের শেষ প্রেম। ভেরার সঙ্গে নাজিমের দেখা হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নেই। পঞ্চাশের দশকে যখন রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে নাজিম হিকমত সোভিয়েত ইউনিয়নে চলে এলেন, তখনই। নাজিমের সঙ্গে ভেরার বয়সের ব্যবধান ছিল ৩০ বছর। নাজিম জন্মগ্রহণ করেন ১৯০২ সালে, ভেরার জন্ম ১৯৩২ সালে।

ভেরা তুলিয়াকোভা ছিলেন নাজিম হিকমতের চতুর্থ স্ত্রী। ১৯৬০ সালে তিনি ভেরাকে বিয়ে করেন। ১৯৬৩ সালের ৩ জুন নাজিম মারা যাওয়ার পরের বছর ভেরা নাজিমের সঙ্গে শেষ কথোপকথন নামে একটি বই লেখেন। এ বইয়ের তিনটি সংস্করণ হয়েছে তুরস্কে—রাশিয়ায় এটি ছাপা হয় ২০০৯ সালে। ২০০৮ সালে ভেরার বইটি অবলম্বন করে ভালোবাসার চেয়ে বেশি কিছু নামে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করা হয়। এটি দেখানো হয় রাশিয়ার সংস্কৃতি চ্যানেলে। নাজিমকে কবর দেওয়া হয় মস্কোর নভোদেভিচিয়েম কবরস্থানে। সেখানেই সমাহিত হন ভেরা তুলিয়াকোভা। তিনি মারা গেছেন ২০০১ সালের ১৯ মার্চ। এখনো অনেক মানুষ প্রতিদিন তাঁদের সমাধিস্থলে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন।

নাজিমের সঙ্গে শেষ কথোপকথন নামে যে বইটি লিখেছিলেন ভেরা, তা থেকে চারটি চুম্বক ঘটনার উল্লেখ করা হলো এখানে। বইটির নামই বলে দিচ্ছে, এটা কোনো জীবনীগ্রন্থ নয়। ভেরা তুলিয়াকোভা হিকমত যেভাবে দেখেছেন নাজিম হিকমতকে, সেভাবেই লিখেছেন। বইটি লেখা হয়েছে কথা বলার মতো করে। লেখাটি ছাপা হয়েছে মিডিয়াম ডট কম–এ। 

প্রথম স্বীকারোক্তি

একদিন তুমি আমাকে ফোন করলে, বললে পুরোনোকালের ফরাসি ছবি রাইকের সন্তানেরা দেখতে চাও। এই ছবির প্রদর্শনী করা সে আমলের জন্য ছিল খুবই কঠিন কাজ। আমরা রাষ্ট্রীয় আর্কাইভ থেকে বহু কষ্টে সে ছবি বের করলাম। ১৯৫৬ সালের ৩ নভেম্বর তুমি এলে ছবিটি দেখতে। সঙ্গে নিয়ে এলে বাবায়েভসহ কয়েকজন বন্ধুকে।

বছরের প্রথম দিকের তুষারপাতের সময় বলে ঘর গরম করার যন্ত্রগুলো তখনো ছাড়া হয়নি। খুব ঠান্ডা ছিল হলটি। আমরা পোশাক না ছেড়েই ওভারকোট পরে বসে গেলাম সিটে। বিষণ্ন, মলিন আর্লেকিনের প্রেমে বিমোহিত লুই বারো তাঁর অনুভূতির প্রকাশ দিয়ে আমাদের বিমোহিত ও বিস্মিত করলেন। তুমি খুবই রোমাঞ্চিত ছিলে সেদিন। তুমি আমাকে পাশে এসে বসতে বললে। আমি খেয়াল করে দেখলাম, তোমার মধ্যে কেমন এক অস্থিরতা। আমার মনে হলো, তুমি শীতে জমে যাচ্ছ, তাই আমি বুফেত (ক্যানটিন) থেকে তোমার জন্য গরম চা নিয়ে এলাম। তুমি চা খেলে, কিন্তু হাতেই রেখে দিলে চায়ের গ্লাস (কাপে নয়, রুশ দেশে সাধারণত রং চা খাওয়া হয় বড় বড় কাচের গ্লাসে)। আমি গ্লাসটা ক্যানটিনে নিয়ে যাই, সেটা তুমি চাওনি। ছবিটি আমার মনে তুমুল আলোড়ন তুলল। আমি সেদিনই প্রথম জনপ্রিয় অভিনেতা লুই বারোর অভিনয় দেখলাম। তাঁকে আমি কখনোই ভুলব না। কারণ, তাঁর সঙ্গেই আমার জীবনের সবচেয়ে দামি মুহূর্তটির সংযোগ। সেই মুহূর্ত বিস্মিত হওয়ার, মুক্তির।

নাজিম, তুমি তোমার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালে। হঠাৎ করেই উঠে দাঁড়ালে এবং বললে, ‘আমার এখন যেতে হবে।’ আমি খুবই অবাক হলাম, এই সিনেমা দেখার জন্য নিজেই অনুরোধ করেছিলে তুমি আর এখন ছবিটা পুরো না দেখেই বেরিয়ে যাচ্ছ!

‘আপনার কি ছবিটা ভালো লাগছে না?’

‘দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, ছবি দেখার সময় নেই আমার। সময় নেই...আপনি কি আমাকে একটু এগিয়ে দেবেন?’

আমরা সিনেমা হল থেকে বের হয়ে এলাম। তুমি তোমার স্বভাবের সঙ্গে যায় না, এ রকম দ্রুততার সঙ্গে হাঁটছিলে, মনে হচ্ছিল তুমি দৌড়াচ্ছ। তা দেখে আমার মনে হলো, তোমার বুকে ব্যথা করছে। তুমি কারও কাছে নিজের কষ্টের কথা বলতে না, অন্যের কষ্ট সব সময় নিজের কাঁধে নিতে। প্রথম ও দ্বিতীয় তলার সিঁড়ির সন্ধিতে এসে তুমি দাঁড়ালে, তারপর নীরবে তাকিয়ে রইলে আমার দিকে। কনুইয়ের কাছে আমার হাতটা ধরে রাখলে। সেভাবেই আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম, নীরবে। তোমার চোখ ঘুরে বেড়াচ্ছিল আমার মুখে।

‘আমি আপনাকে ভালোবাসি। আপনি কি বুঝতে পারছেন? আমি আপনাকে ভালোবাসি।’ খুব নিচু স্বরে তুমি এ কথা বলেছিলে ও কাঁদছিলে।

কোনো পুরুষকে আমি কখনো কাঁদতে দেখিনি। তোমার কথার তোড়ে, তোমার চোখের জলে আমার পায়ের নিচ দিয়ে আলো দুলে দুলে যাচ্ছিল...আমরা সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ছিলাম, আমি তোমার কান্নাভেজা চেহারার দিকে পলকহীন তাকিয়ে ছিলাম। তখন দুপুরের খাবারের ছুটি, তাই আমাদের পাশ দিয়ে অনেকেই ওপরে উঠছিল, নিচে নামছিল, কিন্তু তা আমাদের চোখে পড়ছিল না। 

পলায়ন

(নাজিম হিকমতের সঙ্গে ভেরার যখন দেখা হয়, তখন তিনি বিবাহিত, তাঁর সে সময় এক মেয়েসন্তান সংসারে। নাজিমের জন্য ভেরা তাঁর সংসার ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তা খুব সহজ ছিল না)

শীতের সে সন্ধ্যায় একটা ছোট স্যুটকেস হাতে নিয়ে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম রাস্তার পাশের ফুটপাতে। অপেক্ষা করছিলাম তোমার জন্য। ভাবছিলাম, ‘আমি তো আজ আমার পুরোনো বাড়িটা পরিষ্কার করিনি, আজ তো আমি ধুলা ঝাড়িনি, ঘর মুছিনি...ফেরা দরকার বাড়িতে...।’ তবে দাঁড়িয়ে ছিলাম, এখানে যেন পাথরের মতো আটকে গিয়েছিল পা, নড়তে পারছিলাম না। অপেক্ষা করছিলাম তোমার জন্য। তুমি আসছিলে না। দশ, পনেরো, বিশ মিনিট কেটে গেল। ‘দেরি হচ্ছিল যখন আমার, তখন তুমি কী ভাবছিলে?’ ট্রেনে উঠে তুমি বললে আমাকে।

আমি মনে মনে বলছিলাম, হে ঈশ্বর, তোমার কিছু একটা হয়ে যাক, যেন তুমি না আসো।

‘তুমি ভাবছিলে আমার গাড়িতে কিছু একটা হয়েছে? অ্যাকসিডেন্ট?’

‘হয়তো...।’

‘কোনো সন্দেহ নেই, আমার হবু বউটা দারুণ!’

‘আমি আজ থেকে দশ দিন আগে এই রাস্তায়ই মারা যাচ্ছিলাম। জীবনে প্রথমবারের মতো কাউকে প্রতারিত করেছি...।’ আমি বললাম।

‘সেটা আমি বুঝি, কিন্তু তুমি একবারও ভাবলে না, একজন মানুষ তোমার জন্য বেঁচে উঠল, তাই না?’ 

বিয়ের বিষয়ে বোঝাপড়া

বিয়েই শুধু তোমার সুখের গ্যারান্টি দিতে পারে। কিন্তু আমি আর তখন তোমাকে বিশ্বাস করতাম না। আমার মনে হতো, বিয়ে করলে তুমি তুরস্কের গ্রাম্য কিছু মানুষের মতো আমার জন্য ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে উঠবে। তুমি নিজেই গল্প করেছিলে আমাকে, তুরস্কের জেলখানায় সে রকম কয়েকজন বন্দীর সঙ্গে তোমার দেখা হয়েছে, যারা তাদের স্ত্রীকে খুন করে জেল খাটছে। আমার মনে হচ্ছিল, তুমিও আমার সঙ্গে তুরস্কের অশিক্ষিত চাষাদের মতো ব্যবহার করতে শুরু করবে, আমার মুখ ঢেকে দেবে রুমাল দিয়ে, আটকে রাখবে ঘরে। তাই আমি বলে উঠলাম, ‘না, আমরা বিপ্লবের পরবর্তী সময়ের মতো থাকব।’

তুমি আমাকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছ, কষ্ট পেয়েছ, রাগ করেছ। আমার মায়ের কাছে গেছ, মাকে বলেছ আমাকে বোঝাতে। বলেছ, আমার মেয়ে বড় হয়ে আমাকে দুষবে। এমনকি এ কথাও তুমি বলেছিলে, ‘তোমার সম্পর্কে মানুষ খারাপ কথা বলুক, এটাই তুমি চাও!’

আমি তোমার কোনো কথাই শুনিনি। সত্যিই আমি ভেবেছি, বিয়ে করলে তুমি কাপড় দিয়ে আমার মুখ ঢেকে দেবে, আর তোমার সীমাহীন ভালোবাসা আর উন্মাদপ্রায় ভয়ের কারণে আমার জীবনটা নরকে পরিণত হবে। তখন তুমি চলে গেলে ভোলপিনকে ফোন করার জন্য। তাঁকে অনুরোধ করলে বাড়িতে আসতে।

আমরা টেবিলের পাশে চেয়ারগুলোয় বসে ছিলাম। তুমি তোমার মতামত জানাচ্ছিলে ভোলপিনকে। তুমি যুক্তি দিয়ে বোঝাচ্ছিলে কেন আমাদের বিয়ে হওয়া উচিত। তুমি বলছিলে, মাঝেমধ্যে তোমাকে বিদেশে যেতে হবে, বিয়ে না হলে তুমি তো আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবে না। আমাকে নিয়ে যেতে না পারলে সেটা তোমাকে দুঃখ দেবে, কষ্ট দেবে। এ কারণে তুমি স্বাভাবিকভাবে তোমার কাজ করতে পারবে না। এ ছাড়া তুমি বলেছিলে, আমি তোমার বাড়িতে নিবন্ধন না করেই আছি, (তখনো তুমি ভাবতে, বিয়ে করলেই বুঝি নিবন্ধন পাওয়া যাবে); এমনকি বিয়ে না করলে আমরা একসঙ্গে লেনিনগ্রাদেও যেতে পারব না, একসঙ্গে হোটেলে ঢুকতেও দেবে না আমাদের। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তুমি মরে গেলে আমার কোনো পরিচয় থাকবে না, খোলা রাস্তায় আমি অসহায় হয়ে বসে থাকব—এই ভাবনা তোমাকে পাগল করে দিচ্ছে। লেখক সমিতিতে এক আইনজীবীর মুখে তুমি শুনেছ, সোভিয়েত আইন অনুযায়ী মৃত্যুর পর আরও ৩০ বছর স্ত্রীর ভরণপোষণের অধিকার আছে স্বামীর। তুমি বলতেই থাকলে, বলতেই থাকলে, বলতেই থাকলে। তোমার প্রতিটি কথাই ছিল বুদ্ধিদীপ্ত। তোমার যুক্তির বিপরীতে কিছু বলার সুযোগ ছিল না। কিন্তু যে বিষয়ে আমার মূল প্রতিবন্ধকতা, সে কথা তুমি ভোপলিনকে ব্যাখ্যা করোনি। বলেছিলে, ‘ভোপলিন, ভাই আমার, ওকে ওর কথা বলো, বোঝাও, ও তোমার কথা শুনবে।’

‘ভেরা কেন তোমাকে বিয়ে করতে চাইছে না?’ জানতে চাইল মিখাইল দাভিদোভিচ (ভোলপিন)।

‘আমি জানি না। তুমি ওকেই জিজ্ঞেস করো।’ মিথ্যে বললে তুমি।

‘কেন তুমি বিয়ে করতে চাইছ না? বলো তো!’

‘ও কালো মানুষ, তাই।’

তুমি চিৎকার করে উঠলে, ‘দেখলে, দেখলে, দেখো আর কী বলে!’

‘কেন ও “কালো মানুষ”? খুব গম্ভীর হয়ে জানতে চাইল ভোলপিন।

‘কারণ, ও আমার প্রতি খুবই ঈর্ষান্বিত। আমার আশপাশে কাউকে সহ্য করতে পারে না।’ নিজের মতো করে বলার চেষ্টা করল নাজিম। ‘যখন আমি জেলে গেলাম, তখন আমি যুবক। আমার নায়কেরা যে রকমভাবে প্রেম করে, সে রকম প্রেম আমি জীবনে কখনো করিনি। আমি তো নাটক লিখেছি, আমার মতে, এই নাটকটি তত্ত্বগতভাবে আমার লেখা সেরা নাটক, বুঝেছ? এখন আমার জীবনে সেই ঘটনাটা ঘটেছে। আমি প্রেমে পড়েছি। তোমাদের এখানে এটাকে বলে, রাজহাঁসের গান। আমি জানি না আমারটা রাজহাঁসের গান, নাকি ষাঁড়ের গান, কিন্তু যা-ই হোক না কেন, এটা প্রেম। এটাই শেষতম ব্যাপার, যা করতে পারে আমার হৃদয়। এখন, তোমাকে বুঝতে হবে ভাই, আমি ব্যাখ্যা করছি: আমাকে আমার বয়সের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ জীবন যাপন করতে হবে। ধরো, আমার বয়স যদি এখন চল্লিশ হতো, তাহলেও আমি ভেরাকে ভালো বাসতাম, কিন্তু সে বয়সে এখনকার মতো এত কষ্ট পেতাম না। সে ক্ষেত্রে আমার ভালোবাসা হতো প্রশান্ত। কেন তা ভাবছি? ভাবছি এ কারণে যে তাহলে আমাদের সামনে পড়ে থাকত অনেক বড় সময়। যেকোনো স্বাভাবিক সংসারের মতো আমাদের সংসারে আসত সন্তান। তো এখন বয়স শুধু চল্লিশ নয়, আমি অসুস্থ। আমার হার্ট অ্যাটাকও হয়ে গেছে। তার মানে হচ্ছে, আমার জীবন খুব বেশি প্রলম্বিত হবে না, তাই ভালোবাসার জন্য আমার হাতে খুব কম সময় রয়েছে। বুঝতে পারছ? তাই আমি প্রতিটা মুহূর্তে ওর মুখ দেখতে চাই, অন্য কারও সঙ্গে ওকে দেখলে আমার সহ্য হয় না। এমনকি ও বই পড়লে, দোকানে গেলেও আমি সহ্য করতে পারি না, যদি না আমি ওর সঙ্গে থাকি। তোমরা জানো, আমি একটু বেশি সময় জেলে কাটিয়েছি—১৭ বছর! আমার যে ঈর্ষা, তা অন্য পুরুষের প্রতি নয়। বরং ওর আশপাশে কাউকেই আমি সহ্য করতে পারি না। এমনকি রাগের মাথায় ওদের গায়ে হাতও দিয়ে ফেলতে পারি! আমার ঈর্ষা ঠিক এ জন্য নয়। সেটা আরেকটু ওপরের স্তরের ব্যাপার। কিন্তু যখন আমি দেখি কোনো বোকা মানুষ, অসুন্দর মানুষ, এমনকি ভুঁড়িওয়ালা অতিকায় কেউ ওর কাছাকাছি, তখন আমার অস্থির লাগে। কারণ, ওকে আমি হারাতে চাই না। আমি তো এটাও জানি, কোনো কোনো সময় ভালোবাসা যুক্তি মানে না। হতে পারে হঠাৎ ঘরের দরজা দিয়ে ঢুকল এক অসুন্দর খর্বাকায় মানুষ, কিন্তু তাতেই জ্বলে উঠল প্রেমের আগুন—ব্যস, সব শেষ! আমার যা হচ্ছে, তেমনই, ভালোবাসা সব সময় খুব বুদ্ধিমান, যৌক্তিক বিষয় নয়। ভালোবাসা বেশির ভাগ সময়ই বোকা বোকা হয়, বুঝলে ভাই ভোলপিন...তাই কষ্ট পাই, তাই ওর কাছ থেকে একটু সহযোগিতা চাই...বিয়ের অনুষ্ঠান হয়তো এ অবস্থা থেকে মুক্তি দেবে না, আবার দিতেও পারে, একবার তো ট্রাই করে দেখা যায়!’

যখন ভোলপিন উঠে দাঁড়াল, ওভারকোট নিল দরজার কাছ থেকে, তখন সে আমাকে আলিঙ্গন করে বলল, ‘নাজিম ঠিক বলেছে। ওকে বিয়ে করো। প্রেমিক মানুষের অনুভূতিই তো দেখতে পেলাম ওর মধ্যে। এটা খুব ভালো। আর তুমি, নাজিম, এত উত্তেজিত না হয়ে একটু শান্ত হও। তুমি শান্ত না হলে ভেরার পক্ষে এটা বহন করা শক্ত হবে। তোমার তুর্কি তৃষ্ণার সঙ্গে মিলে চলা খুব সহজ কাজ নয়। তাই একটু সহজ করে সবকিছু করার চেষ্টা করো। সেটাই ঠিক হবে। ভালো হবে। আমি নিশ্চিত!’

মনে আছে, কীভাবে আমরা বিয়ে রেজিস্ট্রি করতে গিয়েছিলাম। গিয়েছিলাম ট্যাক্সিতে করে, সঙ্গে ছিল আমার বন্ধু তোসিয়া। আমি আর তোসিয়া ট্যাক্সি থেকে নামলাম। নাজিম ভাড়া মেটানোর জন্য সেখানে থাকল। ভাড়া মিটিয়ে যখন ফিরল, তখন ওর মুখে উজ্জ্বল হাসি। বলল, ‘ট্যাক্সিচালকের সঙ্গে আমার যা মজার কথা হয়েছে! ও আমাকে জিজ্ঞেস করল, “মাফ করবেন, আপনি কি নাজিম হিকমত?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, আমি নাজিম হিকমত।’ “ক্ষমা করবেন, আপনিই কি বিয়ে করতে এসেছেন?” আমি বললাম, “হ্যাঁ ভাই। আমিই বিয়ে করতে এসেছি।” এবার মুখ কালো করে ট্যাক্সিচালক বলল, “কমরেড হিকমত, কমরেড হিকমত, আপনি এতগুলো বছর জেলখানায় ছিলেন, তারপরও বন্দিজীবনের প্রতি আগ্রহ আপনার?” আমি ওকে বললাম, “বন্দিজীবনটাই আমার অভ্যাস হয়ে গেছে, ভাই। কিছুই করার নেই।”

মজার ব্যাপার, বিয়েই তোমার মনে শান্তি এনে দিল, আমরা একসঙ্গে পথচলার অধিকার পেলাম, সব সময় একে অন্যের কাছাকাছি থাকার সুযোগ পেলাম, আর তুমি তাতে খুব খুশি হলে। 

মৃত্যু

সেদিন সকালে অন্য দিনের তুলনায় একটু আগেই ঘুম ভেঙে গিয়েছিল আমার। ঘুম ভেঙে গিয়েছিল পর্দাহীন জানালা দিয়ে সূর্যের আলো এসে সরাসরি আমার চোখে পড়ছিল বলে। ঘর ছিল নিস্তব্ধ। আমি উঠিনি, তোমার ঘুম ভাঙাতে চাইনি। মিনিট পনেরো পর আমাদের চিঠির বাক্সে ডাকপিয়নের চিঠি ফেলার শব্দ পেলাম, তার মানে ৭টা ২০ বেজে গেছে। আমি শব্দ না করে লেটারবক্স খুললাম, যেন সকালবেলায় বিকট শব্দে কারও ঘুমের ব্যাঘাত না হয়। কিন্তু প্রতিদিনই ডাকপিয়ন আসার পর তোমার ঘুম ভেঙে যেত, এমনকি ঘুমের মধ্যেও তুমি চাইতে এই মুহূর্তটিতে যেন তোমার ঘুম ভেঙে যায়। এর মিনিট পাঁচেক পর তুমি হঠাৎ সটান উঠে পড়লে এবং দ্রুত দৌড়ে গেলে দরজার দিকে। আমি তোমাকে ডাকতে চাইলাম, কিন্তু ভাবলাম, আরেকটু ঘুমিয়ে নিই। তুমি আর ফিরে এলে না। এক মিনিট পার হলো, দুই মিনিট পার হলো, কিন্তু দরজায় তোমাকে দেখা গেল না। আরও খানিকক্ষণ আমি শুয়ে থাকলাম, কিন্তু কী যেন কী হয়ে গেল আমার, আমি উঠে তোমাকে খুঁজতে লাগলাম। কোথায় লুকালে তুমি? ভাবলাম, হয়তো পানির তেষ্টা পেয়েছে, কিংবা সিগারেট খাচ্ছ। আমি খুব তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে এসে তোমাকে খুঁজলাম। না, সেখানে তুমি নেই। আমি স্নানের ঘরে খুঁজলাম, টয়লেটে খুঁজলাম। হঠাৎ আমার ভয় করতে লাগল, এমন ভয় করতে লাগল, মনে হতে থাকল, পেছন থেকে গরম বাতাস এসে আমাকে জড়িয়ে ধরছে...।

আমি দৌড়ে গেলাম হলঘরে, সেখানে দেখলাম তোমাকে। তুমি বসে ছিলে, দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে, হাত দুটো ঠেকে ছিল মেঝেয়, এক পা তুর্কি কায়দায় ভাঁজ করা, অন্য পা প্রসারিত সামনের দিকে। তোমার স্বভাবের সঙ্গে বেমানান শান্ত চেহারাটা দেখেই আমার মনে হলো, তুমি মরে গেছ।

মুহূর্তের মধ্যে আমাকে ছেড়ে দিল পৃথিবী। পৃথিবী বোবা-কালা হয়ে গেল। আমি তোমার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলাম, তুমি উত্তর দিলে না। আমি বুঝলাম, সব শেষ।

সেদিন সকালেই আমি আমার একটা ছবি উল্টে দেখলাম, সেখানে কবিতা লিখেছ তুমি। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা তোমার কবিতা। এখন ভাবি, নাজিম, তুমি কবে আমার জন্য এই কবিতা লিখেছিলে? যেখানেই থাকো, সেখান থেকে কোনো এক সংকেত দাও যেন আমি বুঝতে পারি, কবে লিখেছ এ কবিতা।

‘দ্রুত এসো আমার কাছে’—বলেছিলে

‘আনন্দ দাও আমাকে’—বলেছিলে

‘আমাকে ভালোবাসো’—বলেছিলে

‘নিজেকে শেষ করে দাও’—বলেছিলে

দ্রুত এসেছি

আনন্দ দিয়েছি

ভালোবেসেছি

মরে গেছি।